০৮:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১০ বছরেও সংস্কার হয়নি সেতু, বাঁশের সাঁকোয় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার,দুর্ভোগে দুই গ্রামের মানুষ।


৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সারা জমিন গিয়ে দেখা যায় একটি সেতু, অথচ নেই চলাচলের নিরাপদ ব্যবস্থা। প্রায় ১০ বছর ধরে ভাঙা সংযোগ সড়ক, নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো আর প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়েই চলতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে হয় কাঁধে করে, কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। এমন চিত্র কুড়িগ্রাম পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নামা ভেলাকোপা ও টাপু ভেলাকোপা গ্রামের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খালের ওপর নির্মিত সেতুটির পূর্ব পাশের সংযোগ সড়কটি ২০১৭ সালে বন্যায় সুরক্ষাব্যবস্থাসহ ভেঙে যায়। এতে সেতুটির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সংযোগ সড়কটি সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বাধ্য হয়ে এলাকাবাসী নিজেরাই চাঁদা তুলে এবং বাঁশ-কাঠ সংগ্রহ করে অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করেন। সেই নড়বড়ে সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার পদপ্রার্থী মোঃ বাবলু মিয়া বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে মানুষ এভাবে কষ্ট করছেন। সমস্যা সমাধানের দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছেন। পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে কতবার যে যাওয়া হয়েছে, তার হিসাব নেই। প্রতিবারই কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
গ্রাম্য চিকিৎসক ফয়জাল আলী বলেন, পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বহু পরিবারের বসবাস। সেতুর সংযোগ সড়ক ভেঙে যাওয়ার পর এলাকাবাসী নিজেরাই চাঁদা তুলে রাস্তা মেরামত করেছেন এবং বাঁশ-কাঠ দিয়ে সাঁকো তৈরি করেছেন। নাগরিক হিসেবে পৌরসভার সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও বছরের পর বছর তাঁদের নিজ উদ্যোগেই চলাচলের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
শুধু পৌরসভার বাসিন্দারাই নন, পাশের পাঁচগাছী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওয়াবশ গ্রামের প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবারের মানুষও এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল। ওই গ্রামের বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, সেতুর সংযোগ সড়ক সংস্কার না হওয়ায় তাঁদের যাতায়াতে চরম অসুবিধা হচ্ছে। গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে কাঁধে করে নিয়ে যেতে হয়। এদিকে কোনো অটোরিকশা কিংবা রিকশা আসতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে নদী পারাপারের জন্য নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। আমরা খুব অসহায় অবস্থায় আছি।
তিনি আরও বলেন, এলাকায় প্রচুর কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। শাকসবজি থেকে শুরু করে কলা পর্যন্ত বিভিন্ন ফসল আবাদ করেন কৃষকেরা। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় উৎপাদিত পণ্য পরিবহন করতে পারেন না তাঁরা। এতে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই দ্রুত সেতুর সংযোগ সড়ক মেরামত করা প্রয়োজন।
প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চলাচল করছেন। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের জন্য সাঁকোটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথম শ্রেণির পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়েও তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত। তাঁদের প্রশ্ন, একের পর এক তিনজন মেয়র দায়িত্ব পালন করলেও কেন এই গুরুত্বপূর্ণ সেতুর সংযোগ সড়ক সংস্কার করা সম্ভব হলো না? পৌরসভার নাগরিক হয়েও কেন বছরের পর বছর এমন অবহেলা ও দুর্ভোগের শিকার হতে হবে তাঁদের? এই এলাকার মানুষ কি পৌরসভার নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন না?
এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা জানান, সেতুর সংস্কারসংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে কবে নাগাদ সংস্কারকাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, আর আশ্বাস নয়, এবার তাঁরা বাস্তব উদ্যোগ দেখতে চান। দ্রুত সেতুর সংযোগ সড়ক পুনর্নির্মাণ, প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত এবং স্থায়ী ও টেকসই যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও জনস্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

১০ বছরেও সংস্কার হয়নি সেতু, বাঁশের সাঁকোয় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার,দুর্ভোগে দুই গ্রামের মানুষ।

১০ বছরেও সংস্কার হয়নি সেতু, বাঁশের সাঁকোয় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার,দুর্ভোগে দুই গ্রামের মানুষ।

Update Time : ০৬:৪৭:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬


৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সারা জমিন গিয়ে দেখা যায় একটি সেতু, অথচ নেই চলাচলের নিরাপদ ব্যবস্থা। প্রায় ১০ বছর ধরে ভাঙা সংযোগ সড়ক, নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো আর প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়েই চলতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে হয় কাঁধে করে, কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। এমন চিত্র কুড়িগ্রাম পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নামা ভেলাকোপা ও টাপু ভেলাকোপা গ্রামের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খালের ওপর নির্মিত সেতুটির পূর্ব পাশের সংযোগ সড়কটি ২০১৭ সালে বন্যায় সুরক্ষাব্যবস্থাসহ ভেঙে যায়। এতে সেতুটির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সংযোগ সড়কটি সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বাধ্য হয়ে এলাকাবাসী নিজেরাই চাঁদা তুলে এবং বাঁশ-কাঠ সংগ্রহ করে অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করেন। সেই নড়বড়ে সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার পদপ্রার্থী মোঃ বাবলু মিয়া বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে মানুষ এভাবে কষ্ট করছেন। সমস্যা সমাধানের দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছেন। পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে কতবার যে যাওয়া হয়েছে, তার হিসাব নেই। প্রতিবারই কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
গ্রাম্য চিকিৎসক ফয়জাল আলী বলেন, পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বহু পরিবারের বসবাস। সেতুর সংযোগ সড়ক ভেঙে যাওয়ার পর এলাকাবাসী নিজেরাই চাঁদা তুলে রাস্তা মেরামত করেছেন এবং বাঁশ-কাঠ দিয়ে সাঁকো তৈরি করেছেন। নাগরিক হিসেবে পৌরসভার সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও বছরের পর বছর তাঁদের নিজ উদ্যোগেই চলাচলের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
শুধু পৌরসভার বাসিন্দারাই নন, পাশের পাঁচগাছী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওয়াবশ গ্রামের প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবারের মানুষও এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল। ওই গ্রামের বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, সেতুর সংযোগ সড়ক সংস্কার না হওয়ায় তাঁদের যাতায়াতে চরম অসুবিধা হচ্ছে। গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে কাঁধে করে নিয়ে যেতে হয়। এদিকে কোনো অটোরিকশা কিংবা রিকশা আসতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে নদী পারাপারের জন্য নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। আমরা খুব অসহায় অবস্থায় আছি।
তিনি আরও বলেন, এলাকায় প্রচুর কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। শাকসবজি থেকে শুরু করে কলা পর্যন্ত বিভিন্ন ফসল আবাদ করেন কৃষকেরা। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় উৎপাদিত পণ্য পরিবহন করতে পারেন না তাঁরা। এতে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই দ্রুত সেতুর সংযোগ সড়ক মেরামত করা প্রয়োজন।
প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চলাচল করছেন। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের জন্য সাঁকোটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথম শ্রেণির পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়েও তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত। তাঁদের প্রশ্ন, একের পর এক তিনজন মেয়র দায়িত্ব পালন করলেও কেন এই গুরুত্বপূর্ণ সেতুর সংযোগ সড়ক সংস্কার করা সম্ভব হলো না? পৌরসভার নাগরিক হয়েও কেন বছরের পর বছর এমন অবহেলা ও দুর্ভোগের শিকার হতে হবে তাঁদের? এই এলাকার মানুষ কি পৌরসভার নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন না?
এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা জানান, সেতুর সংস্কারসংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে কবে নাগাদ সংস্কারকাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, আর আশ্বাস নয়, এবার তাঁরা বাস্তব উদ্যোগ দেখতে চান। দ্রুত সেতুর সংযোগ সড়ক পুনর্নির্মাণ, প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত এবং স্থায়ী ও টেকসই যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও জনস্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।