০২:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ড. সাইফুল্লাহ আওয়ামী প্রভাবে এক দশকে ৩৫ বার বিদেশ সফর।

  • শাহীনুল হক।
  • Update Time : ০৫:৪১:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২২৩ Time View

ক্ষমতার পালাবদল হলেও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. এ এস এম সাইফুল্লাহর প্রভাব এখনও বহাল রয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে গত এক দশকে রেকর্ডসংখ্যক বিদেশ সফর, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো অভিযোগের মুখে রয়েছেন তিনি।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনের বিভিন্ন  স্তরে রদবদল হলেও কীভাবে ড. সাইফুল্লাহ মহাপরিচালকের পদে আসীন হলেন, তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এক দশকে তিনি অন্তত ৩৫ বার বিদেশ সফর করেছেন। এসব সফরের তালিকায় অস্ট্রিয়া,যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর ও চীনসহ মোট ১৩টি দেশের নাম রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ও জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের সুযোগ না দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সেমিনার ও প্রশিক্ষণে তিনি নিজেই অংশ নিয়েছেন। জীববিজ্ঞান শাখার বিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার জোরে ভৌতবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও পরিকল্পনা শাখার বৈদেশিক প্রশিক্ষণেও অংশগ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশ সফর কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু বছরের পর বছর একই ব্যক্তির সফরের কারণে অন্য কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ড. সাইফুলস্নাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি ২০১৭ সালের একটি বিদেশ সফরকে ঘিরে। ওই বছরের মে মাসে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে তিনি অংশ নেন। ১১ মে ২০১৭ জারি করা সরকারি আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল,ওই সফরের সব ব্যয় বহন করবে সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থা। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে ২২ মে ওই আদেশ বাতিল করে নতুন জিও জারি করানো হয়। নতুন আদেশে সফরের ব্যয়ের একটি অংশ বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তহবিল থেকে পরিশোধ দেখানো হয়। দাতা সংস্থা যেখানে সম্পূর্ণ ব্যয় বহনের কথা ছিল, সেখানে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ ছাড় দেওয়ার ঘটনায়  দুর্নীতির গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে পরিবর্তন এলেও ড. সাইফুল্লাহ আগের মতোই প্রভাব ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি মহাপরিচালকের পদ বাগিয়ে নেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় তিনি এখনও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন, যা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলেন,বছরের পর বছর একই ব্যক্তি বিদেশ সফরে গেলে অন্যদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নষ্ট হয়। এটি কোনোভাবেই একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য শুভকর নয়।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মহাপরিচালক ড. এ এস এম সাইফুল্লাহর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

ড. সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সার্ক গঠন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানে শহীদ জিয়ার অবদান অনন্য — খন্দকার নাসিরুল ইসলাম

ড. সাইফুল্লাহ আওয়ামী প্রভাবে এক দশকে ৩৫ বার বিদেশ সফর।

Update Time : ০৫:৪১:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬

ক্ষমতার পালাবদল হলেও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. এ এস এম সাইফুল্লাহর প্রভাব এখনও বহাল রয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে গত এক দশকে রেকর্ডসংখ্যক বিদেশ সফর, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো অভিযোগের মুখে রয়েছেন তিনি।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনের বিভিন্ন  স্তরে রদবদল হলেও কীভাবে ড. সাইফুল্লাহ মহাপরিচালকের পদে আসীন হলেন, তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এক দশকে তিনি অন্তত ৩৫ বার বিদেশ সফর করেছেন। এসব সফরের তালিকায় অস্ট্রিয়া,যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর ও চীনসহ মোট ১৩টি দেশের নাম রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ও জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের সুযোগ না দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সেমিনার ও প্রশিক্ষণে তিনি নিজেই অংশ নিয়েছেন। জীববিজ্ঞান শাখার বিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার জোরে ভৌতবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও পরিকল্পনা শাখার বৈদেশিক প্রশিক্ষণেও অংশগ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশ সফর কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু বছরের পর বছর একই ব্যক্তির সফরের কারণে অন্য কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ড. সাইফুলস্নাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি ২০১৭ সালের একটি বিদেশ সফরকে ঘিরে। ওই বছরের মে মাসে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে তিনি অংশ নেন। ১১ মে ২০১৭ জারি করা সরকারি আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল,ওই সফরের সব ব্যয় বহন করবে সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থা। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে ২২ মে ওই আদেশ বাতিল করে নতুন জিও জারি করানো হয়। নতুন আদেশে সফরের ব্যয়ের একটি অংশ বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তহবিল থেকে পরিশোধ দেখানো হয়। দাতা সংস্থা যেখানে সম্পূর্ণ ব্যয় বহনের কথা ছিল, সেখানে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ ছাড় দেওয়ার ঘটনায়  দুর্নীতির গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে পরিবর্তন এলেও ড. সাইফুল্লাহ আগের মতোই প্রভাব ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি মহাপরিচালকের পদ বাগিয়ে নেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় তিনি এখনও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন, যা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলেন,বছরের পর বছর একই ব্যক্তি বিদেশ সফরে গেলে অন্যদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নষ্ট হয়। এটি কোনোভাবেই একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য শুভকর নয়।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মহাপরিচালক ড. এ এস এম সাইফুল্লাহর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

ড. সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।