০৭:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আশুলিয়ায় সরকারি পুকুর পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়ম, উত্তোলিত মাটি বিক্রি ও সরকারি সম্পদ ক্ষতির অভিযোগ

ঢাকার আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খামারপাড়া গ্রামের একটি সরকারি খাস পুকুর পুনঃখনন, পাড় বাঁধাই ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পকে ঘিরে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ, সরকারি সম্পদের ক্ষতি এবং উত্তোলিত মাটি বিক্রি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির কাজ টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী সম্পন্ন না করে সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্যও ব্যাহত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধীনে টেন্ডারের মাধ্যমে প্রকল্পটির কার্যাদেশ পায় মেসার্স শরীয়তুল্লাহ ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাগর তালুকদার। প্রকল্পের আওতায় সরকারি খাস পুকুর পুনঃখনন, চারপাশে পাড় বাঁধাই, ঘাটলা নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ বাস্তবায়নের কথা ছিল।
প্রতিবেদক: শাহীনুল হক।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আশুলিয়া থানা এলাকায় মোট ৯টি পুকুর পুনঃখনন ও সৌন্দর্যবর্ধনের প্রায় ৯৫ লাখ টাকার কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। টেন্ডার নথি অনুযায়ী, কাজ শুরুর নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৭ নভেম্বর ২০২৫ এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ১৬ জুন ২০২৬।

তবে সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খামারপাড়া গ্রামের এই প্রকল্পের কাজের মূল্য প্রায় ৮ লাখ টাকা হলেও বাস্তব চিত্র টেন্ডারের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগ রয়েছে, পুকুরের ঘাটলা নির্মাণ অসম্পূর্ণ, চারপাশে পাড় বাঁধাই যথাযথভাবে করা হয়নি এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও দৃশ্যমান নয়।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে পুকুর থেকে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ মাটি বিক্রিকে কেন্দ্র করে। স্থানীয়দের দাবি, যে মাটি ব্যবহার করে পুকুরের পাড় উঁচু করা, বাঁধাই এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা, সেই মাটির বড় একটি অংশ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় মাটিই যদি বিক্রি করা হয়, তাহলে টেন্ডারে উল্লেখিত কাজের মান কীভাবে নিশ্চিত করা হলো?

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মিজানুর রহমান অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জেলা প্রশাসকের অনুমোদনক্রমে উত্তোলিত মাটি বিক্রির সরকারি রাজস্ব ট্রেজারিতে চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়েছে। এরপর বিধি মেনেই মাটি বিক্রি ও স্থানান্তর করা হয়েছে।

তিনি জানান, প্রথমে গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকার কবির (স্থানীয়ভাবে ‘মাটি কবির’ নামে পরিচিত) ভেকু মেশিন দিয়ে খননকাজ শুরু করলেও তা শেষ না করেই চলে যান। পরে স্থানীয় মাসুদ পারভেজ প্রায় ৪ লাখ টাকায় মাটি কেনেন। এর মধ্যে প্রথমে ১ লাখ টাকা এবং পরে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। পরবর্তীতে উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে পুকুরটি প্রায় ১৬ ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়।

তবে প্রকল্পটি ঘিরে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো- টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী পুকুরের পাড় নির্মাণে উত্তোলিত মাটি ব্যবহার না করে পাশের সরকারি সলিং রাস্তার মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে সরকারি সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে গ্রামের প্রধান সড়কটি নিচু হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য তারেক আহমেদ হিলারি বলেন, পুকুর পুনঃখননের নামে গ্রামের প্রবেশপথের সরকারি সলিং রাস্তার মাটি কেটে নেওয়ায় বর্তমানে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। অথচ প্রকল্প অনুযায়ী পুকুরের চারপাশে পাড় বাঁধাই, ঘাটলা নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করার কথা ছিল। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঘাটলাগুলো পুনর্নির্মাণ না করে উল্টো সরকারি সম্পদের ক্ষতি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি না থাকায় নিম্নমানের কাজ, অনিয়ম এবং সরকারি সম্পদের অপচয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রকল্পটির টেন্ডার নথি, মাটি বিক্রির অনুমোদন, সরকারি রাজস্ব জমার চালান, কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজের পরিমাপ এবং বিল পরিশোধের নথি তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র উদঘাটন করা হোক।

তাদের আরও দাবি, যদি উত্তোলিত মাটি বিক্রির কারণে পুকুরের পাড়, ঘাটলা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে কিংবা সরকারি রাস্তা কেটে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, তদারকি কর্মকর্তা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী অসম্পূর্ণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে সরকারি সম্পদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে মেসার্স শরীয়তুল্লাহ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সাগর তালুকদার এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

মাগুরায় নকল কীটনাশক বিক্রি, ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা

আশুলিয়ায় সরকারি পুকুর পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়ম, উত্তোলিত মাটি বিক্রি ও সরকারি সম্পদ ক্ষতির অভিযোগ

Update Time : ০৮:৫৭:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

ঢাকার আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খামারপাড়া গ্রামের একটি সরকারি খাস পুকুর পুনঃখনন, পাড় বাঁধাই ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পকে ঘিরে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ, সরকারি সম্পদের ক্ষতি এবং উত্তোলিত মাটি বিক্রি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির কাজ টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী সম্পন্ন না করে সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্যও ব্যাহত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধীনে টেন্ডারের মাধ্যমে প্রকল্পটির কার্যাদেশ পায় মেসার্স শরীয়তুল্লাহ ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাগর তালুকদার। প্রকল্পের আওতায় সরকারি খাস পুকুর পুনঃখনন, চারপাশে পাড় বাঁধাই, ঘাটলা নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ বাস্তবায়নের কথা ছিল।
প্রতিবেদক: শাহীনুল হক।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আশুলিয়া থানা এলাকায় মোট ৯টি পুকুর পুনঃখনন ও সৌন্দর্যবর্ধনের প্রায় ৯৫ লাখ টাকার কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। টেন্ডার নথি অনুযায়ী, কাজ শুরুর নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৭ নভেম্বর ২০২৫ এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ১৬ জুন ২০২৬।

তবে সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খামারপাড়া গ্রামের এই প্রকল্পের কাজের মূল্য প্রায় ৮ লাখ টাকা হলেও বাস্তব চিত্র টেন্ডারের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগ রয়েছে, পুকুরের ঘাটলা নির্মাণ অসম্পূর্ণ, চারপাশে পাড় বাঁধাই যথাযথভাবে করা হয়নি এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও দৃশ্যমান নয়।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে পুকুর থেকে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ মাটি বিক্রিকে কেন্দ্র করে। স্থানীয়দের দাবি, যে মাটি ব্যবহার করে পুকুরের পাড় উঁচু করা, বাঁধাই এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা, সেই মাটির বড় একটি অংশ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় মাটিই যদি বিক্রি করা হয়, তাহলে টেন্ডারে উল্লেখিত কাজের মান কীভাবে নিশ্চিত করা হলো?

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মিজানুর রহমান অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জেলা প্রশাসকের অনুমোদনক্রমে উত্তোলিত মাটি বিক্রির সরকারি রাজস্ব ট্রেজারিতে চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়েছে। এরপর বিধি মেনেই মাটি বিক্রি ও স্থানান্তর করা হয়েছে।

তিনি জানান, প্রথমে গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকার কবির (স্থানীয়ভাবে ‘মাটি কবির’ নামে পরিচিত) ভেকু মেশিন দিয়ে খননকাজ শুরু করলেও তা শেষ না করেই চলে যান। পরে স্থানীয় মাসুদ পারভেজ প্রায় ৪ লাখ টাকায় মাটি কেনেন। এর মধ্যে প্রথমে ১ লাখ টাকা এবং পরে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। পরবর্তীতে উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে পুকুরটি প্রায় ১৬ ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়।

তবে প্রকল্পটি ঘিরে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো- টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী পুকুরের পাড় নির্মাণে উত্তোলিত মাটি ব্যবহার না করে পাশের সরকারি সলিং রাস্তার মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে সরকারি সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে গ্রামের প্রধান সড়কটি নিচু হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য তারেক আহমেদ হিলারি বলেন, পুকুর পুনঃখননের নামে গ্রামের প্রবেশপথের সরকারি সলিং রাস্তার মাটি কেটে নেওয়ায় বর্তমানে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। অথচ প্রকল্প অনুযায়ী পুকুরের চারপাশে পাড় বাঁধাই, ঘাটলা নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করার কথা ছিল। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঘাটলাগুলো পুনর্নির্মাণ না করে উল্টো সরকারি সম্পদের ক্ষতি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি না থাকায় নিম্নমানের কাজ, অনিয়ম এবং সরকারি সম্পদের অপচয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রকল্পটির টেন্ডার নথি, মাটি বিক্রির অনুমোদন, সরকারি রাজস্ব জমার চালান, কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজের পরিমাপ এবং বিল পরিশোধের নথি তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র উদঘাটন করা হোক।

তাদের আরও দাবি, যদি উত্তোলিত মাটি বিক্রির কারণে পুকুরের পাড়, ঘাটলা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে কিংবা সরকারি রাস্তা কেটে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, তদারকি কর্মকর্তা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী অসম্পূর্ণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে সরকারি সম্পদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে মেসার্স শরীয়তুল্লাহ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সাগর তালুকদার এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।