ঢাকার ধামরাইয়ে প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী যশোমাধব দেবের রথযাত্রা উৎসব ও মাসব্যাপী রথমেলার বর্ণাঢ্য উদ্বোধন হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিকেলে ধামরাই পৌর এলাকার কায়েতপাড়া ঐতিহাসিক যশোমাধব মন্দির প্রাঙ্গণে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালন, শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে এবং আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। পরে হাজারো ভক্ত-অনুরাগী ও দর্শনার্থীর অংশগ্রহণে ঐতিহ্যবাহী বিশাল কাঠের রথ টেনে যাত্রাবাড়ী মন্দিরের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ধামরাইয়ের রথযাত্রা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতীক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যুগ যুগ ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে এবং এই রথযাত্রা সেই ঐতিহ্যকেই নতুন করে তুলে ধরে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি মৌলবাদে বিশ্বাস করে না; সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বাংলাদেশই সবার প্রত্যাশা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য মো. তমিজ উদ্দিন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা আহম্মেদ, ঢাকা জেলা পরিষদের প্রশাসক ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদ, ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম, ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন, ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শ্রী শ্রী যশোমাধব মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) জীবন কানাই দাস।
রথযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা শেষে সুসজ্জিত ঐতিহ্যবাহী রথে শ্রী শ্রী যশোমাধব দেবের বিগ্রহ স্থাপন করা হয়। এরপর হাজারো ভক্ত পাটের মোটা রশি ধরে রথ টেনে যাত্রাবাড়ী মন্দিরে নিয়ে যান। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, হরিনাম সংকীর্তন ও ভক্তিমূলক সংগীতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ধামরাই। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত উপভোগ করেন। আগামী ২৪ জুলাই উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে বিগ্রহ পুনরায় মূল মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হবে এবং এর মধ্য দিয়ে উৎসবের ধর্মীয় পর্বের সমাপ্তি ঘটবে।
ধামরাইয়ের শ্রী শ্রী যশোমাধব দেবের রথযাত্রা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসব। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, বাংলা ১০৭৯ সন (প্রায় ১৬৭২-৭৩ খ্রিস্টাব্দ) থেকে এ রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ইতিহাসবিদদের মতে, তৎকালীন স্থানীয় শাসক রাজা যশোপাল একটি মাটির টিলা খননের সময় বিষ্ণুমূর্তি উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে সেই বিগ্রহের নাম রাখা হয় ‘যশোমাধব’ এবং তাকে কেন্দ্র করেই ধামরাইয়ে রথযাত্রা ও রথমেলার সূচনা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই ঐতিহ্য আজও সমান জৌলুসে টিকে রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন গবেষক ও সংস্কৃতিবিদদের মতে, ধামরাইয়ের রথযাত্রা বাংলাদেশের লোকঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ভারতের পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সঙ্গে এর ঐতিহাসিক মিল থাকলেও ধামরাইয়ের নিজস্ব ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও লোকজ বৈশিষ্ট্য একে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে ধামরাইয়ে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মাসব্যাপী রথমেলা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা মেলায় কাঠের খেলনা, মৃৎশিল্প, বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রী, হস্তশিল্প, গৃহস্থালি পণ্য, মিষ্টান্ন, নাগরদোলা, শিশুদের বিনোদনের বিভিন্ন উপকরণ ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা পসরা সাজিয়েছেন। প্রতিদিনই হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে মেলাপ্রাঙ্গণ। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও এই মেলা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
রথযাত্রা ও মেলাকে ঘিরে ধামরাই পৌরশহরজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মেলার প্রবেশপথে আর্চওয়ে গেট, সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি, ওয়াচ টাওয়ার, ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল টিম ও বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো মেলাপ্রাঙ্গণ ও রথযাত্রার রুটে দায়িত্ব পালন করছেন। যানজট এড়াতে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও গ্রহণ করেছে প্রশাসন।
উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, ধামরাইয়ের রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সম্প্রীতি, সহাবস্থান, লোকজ সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক। প্রতিবছরের মতো এবারও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসবটি শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রতিবেদক শাহীনুল হক: 


















