০৮:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সবুজের বুকে আগুনের ছোবল: আলফাডাঙ্গায় রাতের আঁধারে সামাজিক বনায়নের গাছ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ

যে গাছ মানুষকে ছায়া দেয়, অক্সিজেন দেয় এবং পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখে, সেই গাছের গোড়াতেই যেন নেমে এসেছে আগুনের নির্মম আঘাত। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় সামাজিক বনায়নের আওতায় রোপণ করা একাধিক মেহগনি গাছের গোড়ায় আগুন দিয়ে ধ্বংসের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একাধিক গাছ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে আলফাডাঙ্গা-কাশিয়ানী সড়কের লাঙ্গুলিয়া এলাকা থেকে বড়ভাগ সেতু পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মিটার এলাকাজুড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা গাছগুলোর গোড়ায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে কয়েকটি গাছের নিচের অংশ সম্পূর্ণ পুড়ে যায় এবং বাকিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় গাছের গোড়ার অংশ আগুনে ঝলসে গেছে। অনেক গাছের ছাল পুড়ে কালো হয়ে গেছে। কিছু গাছের গোড়ার অংশ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে যেকোনো সময় সেগুলো শুকিয়ে পড়ে যেতে পারে। এতে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্জন এই এলাকায় রাতে মাদকসেবীরা চৈতালী ফসল শুকানোর পর ফেলে রাখা উচ্ছিষ্টে আগুন ধরায়। সেই আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে গাছের গোড়ায় ছড়িয়ে পড়ে এই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

লাঙ্গুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা খিজির মোল্যা বলেন, মাঝেমধ্যেই রাতে এ ধরনের আগুনের ঘটনা ঘটে। আমরা দূর থেকে দেখতে পেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু অনেক সময় দেরি হয়ে যায়, তখন গাছগুলো পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফসল শুকানো ও উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখা বন্ধ না হলে এ সমস্যা থামবে না।

একই এলাকার বাসিন্দা সোহরাব মোল্যা বলেন, এই সড়কে রাতে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। কে বা কারা আগুন দেয় তা দেখা যায় না। তবে এমন ঘটনায় গাছগুলো প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সবুজ পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

এদিকে ওই সড়ক দিয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারী এক পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গাছের সঙ্গে মানুষের এ কেমন শত্রুতা! প্রতিদিন এই পোড়া গাছগুলো দেখে মন খুব খারাপ লাগে। যারা এসব করছে তারা শুধু গাছ নয়, পুরো পরিবেশ ধ্বংস করছে। দ্রুত প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা উপজেলা বন কর্মকর্তা শেখ লিটন বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনা। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে সড়কের পাশে ফসল শুকানো ও দাহ্য উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

পরিবেশ সচেতন মহল বলছে, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ গড়ে উঠতে যেখানে বছরের পর বছর সময় লাগে, সেখানে কয়েক মিনিটের অবহেলা বা আগুনে সেই সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু গাছের ক্ষতি নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার ওপরও গভীর আঘাত।

স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের ঘটনা রোধে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। না হলে সবুজের এই নীরব আর্তনাদ ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করবে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

ফরিদপুরের মধুখালীতে স্টার্টআপ বিজ্ঞান প্রকল্প এবং উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত

সবুজের বুকে আগুনের ছোবল: আলফাডাঙ্গায় রাতের আঁধারে সামাজিক বনায়নের গাছ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ

Update Time : ১০:৪৯:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

যে গাছ মানুষকে ছায়া দেয়, অক্সিজেন দেয় এবং পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখে, সেই গাছের গোড়াতেই যেন নেমে এসেছে আগুনের নির্মম আঘাত। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় সামাজিক বনায়নের আওতায় রোপণ করা একাধিক মেহগনি গাছের গোড়ায় আগুন দিয়ে ধ্বংসের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একাধিক গাছ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে আলফাডাঙ্গা-কাশিয়ানী সড়কের লাঙ্গুলিয়া এলাকা থেকে বড়ভাগ সেতু পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মিটার এলাকাজুড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা গাছগুলোর গোড়ায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে কয়েকটি গাছের নিচের অংশ সম্পূর্ণ পুড়ে যায় এবং বাকিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় গাছের গোড়ার অংশ আগুনে ঝলসে গেছে। অনেক গাছের ছাল পুড়ে কালো হয়ে গেছে। কিছু গাছের গোড়ার অংশ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে যেকোনো সময় সেগুলো শুকিয়ে পড়ে যেতে পারে। এতে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্জন এই এলাকায় রাতে মাদকসেবীরা চৈতালী ফসল শুকানোর পর ফেলে রাখা উচ্ছিষ্টে আগুন ধরায়। সেই আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে গাছের গোড়ায় ছড়িয়ে পড়ে এই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

লাঙ্গুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা খিজির মোল্যা বলেন, মাঝেমধ্যেই রাতে এ ধরনের আগুনের ঘটনা ঘটে। আমরা দূর থেকে দেখতে পেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু অনেক সময় দেরি হয়ে যায়, তখন গাছগুলো পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফসল শুকানো ও উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখা বন্ধ না হলে এ সমস্যা থামবে না।

একই এলাকার বাসিন্দা সোহরাব মোল্যা বলেন, এই সড়কে রাতে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। কে বা কারা আগুন দেয় তা দেখা যায় না। তবে এমন ঘটনায় গাছগুলো প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সবুজ পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

এদিকে ওই সড়ক দিয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারী এক পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গাছের সঙ্গে মানুষের এ কেমন শত্রুতা! প্রতিদিন এই পোড়া গাছগুলো দেখে মন খুব খারাপ লাগে। যারা এসব করছে তারা শুধু গাছ নয়, পুরো পরিবেশ ধ্বংস করছে। দ্রুত প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা উপজেলা বন কর্মকর্তা শেখ লিটন বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনা। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে সড়কের পাশে ফসল শুকানো ও দাহ্য উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

পরিবেশ সচেতন মহল বলছে, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ গড়ে উঠতে যেখানে বছরের পর বছর সময় লাগে, সেখানে কয়েক মিনিটের অবহেলা বা আগুনে সেই সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু গাছের ক্ষতি নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার ওপরও গভীর আঘাত।

স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের ঘটনা রোধে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। না হলে সবুজের এই নীরব আর্তনাদ ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করবে।