ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় ভয়াবহ নদীভাঙনে টগরবন্দ ইউনিয়নের চাপুলিয়া গ্রামের আশ্রয় প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রামের অধিকাংশ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একসময় এসব আশ্রয় প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রামে প্রায় ৪৩০টি পরিবার বসবাস করলেও বর্তমানে গুচ্ছগ্রামে মাত্র ১০টি এবং আশ্রয় প্রকল্পে একটি ঘর টিকে আছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
নদীভাঙন রোধ, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবিতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে চাপুলিয়া গুচ্ছগ্রাম ও আশ্রয় প্রকল্পসংলগ্ন নদীর পাড়ে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। চাপুলিয়া ও শিকিপাড়া গ্রামের তরুণদের উদ্যোগে এলাকাবাসী এ কর্মসূচির আয়োজন করেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া লোকজন বিভিন্ন দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে নদীভাঙন ও অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। এ সময় তারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
স্থানীয়রা জানান, সরকারি অর্থায়নে নির্মিত আশ্রয় প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৪৩০টি পরিবার বসবাস করত। কিন্তু মধুমতি নদীর ভাঙনে একে একে ঘরবাড়ি, বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট ১১টি ঘরও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
শিকিপাড়া ও চাপুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আলফাডাঙ্গা থানা শাখার সভাপতি মাওলানা শরীফুল ইসলাম, আকিব আহমেদ, মাহমুদ হোসেন, নিয়ামুল মোল্যা ও তাইফুর রহমানসহ একাধিক যুবক বলেন, ৪৩০টি পরিবার যেখানে দীর্ঘদিন বসবাস করেছে, সেখানে এখন হাতে গোনা কয়েকটি ঘর অবশিষ্ট রয়েছে। নদীভাঙনে মানুষ ঘরবাড়ি, বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙন আরও তীব্র হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
ভুক্তভোগী আরিফুল মোল্লা (৪৫), বিলু মোল্যা (৩৮), আজগার হোসেন (৪৫) ও লিয়াকত আলী (৭০) সহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, ২৫-৩০ বছর ধরে তারা এই এলাকায় বসবাস করছেন। এখানেই তাদের জীবন কেটেছে, সন্তানদের বড় করেছেন। কিন্তু নদীভাঙনে একে একে ঘরবাড়ি, বসতভিটা, জমিজমা ও শেষ সম্বলটুকুও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন তাদের মাথা গোঁজার মতো কোনো জায়গা নেই। খোলা আকাশের নিচে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। জীবিত মানুষ হয়েও এখন কবরস্থানের পাশে আশ্রয় নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কতিপয় অসাধু বালু ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন। তাদের দাবি, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও তীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভাঙন বাড়ছে।
টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান বলেন, নদীভাঙনে চাপুলিয়ার মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। আশ্রয় প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রামের অধিকাংশ ঘর বিলীন হয়ে গেছে। দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন প্রয়োজন। অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, ফরিদপুরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মজিবর রহমান বলেন, চাপুলিয়া এলাকায় নদীভাঙনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীতীর রক্ষায় সম্ভাব্য কারিগরি ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি 


















