০৫:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঐতিহ্য হারানোর পথে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতি: দলাদলি, মতবিরোধ ও আদর্শিক সংকটে কোণঠাসা বাম আন্দোলন

একসময় বাংলাদেশের গণআন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল কমিউনিস্ট আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের অবদান ইতিহাসের অংশ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই ঐতিহ্য আজ অনেকটাই ম্লান। আদর্শিক বিভক্তি, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, দলাদলি, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং জনসম্পৃক্ততার সংকটে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতি এখন অস্তিত্বের প্রশ্নের মুখোমুখি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের বাম রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের নিজেদের ভেতরের বিভাজন। একই আদর্শে বিশ্বাসী একাধিক দল, উপদল ও প্ল্যাটফর্মে বিভক্ত হওয়ায় গণভিত্তি যেমন ক্ষয় হয়েছে, তেমনি দুর্বল হয়েছে আন্দোলনের ধারাবাহিকতাও। মতাদর্শগত মতপার্থক্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে, যা নতুন নেতৃত্বের বিকাশ এবং সাংগঠনিক সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নিয়েও বিতর্ক কম নয়। সমালোচকদের অভিযোগ, দলটি অতীতের শ্রেণিসংগ্রামভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে সংসদীয় ও সংস্কারমুখী রাজনীতিতে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে দলটির বক্তব্য, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও জনগণের দৈনন্দিন অধিকার আদায়ের লড়াইই বর্তমান কৌশল।
বাস্তবতা হলো, একসময়ের প্রভাবশালী বাম রাজনীতি আজ জাতীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে কার্যত প্রান্তিক। শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র আন্দোলন এবং কৃষক সংগঠনেও তাদের প্রভাব আগের তুলনায় কমেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে বাম রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান সাফল্য দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংকটের জন্য একক কোনো কারণকে দায়ী করা কঠিন। তবে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে আসে
দীর্ঘদিনের দলাদলি ও নেতৃত্বের কোন্দল সংগঠনগুলোর শক্তি ক্ষয় করেছে।
মতাদর্শগত বিভক্তি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সম্ভাবনাকে দুর্বল করেছে।
জনগণের বাস্তব অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে কার্যকর রাজনৈতিক উপস্থিতি কমে যাওয়ায় জনভিত্তি সংকুচিত হয়েছে।
পরিবর্তিত অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন সাংগঠনিক কৌশল ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ব্যর্থতা বাম রাজনীতিকে আরও প্রান্তিক করেছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐতিহ্য নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ। কিন্তু সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে অতীতের গৌরবের ওপর নির্ভর না করে আত্মসমালোচনা, সাংগঠনিক ঐক্য, নেতৃত্বের নবায়ন এবং জনগণের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে আরও গভীর সংযোগ স্থাপন করতে হবে। অন্যথায় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই রাজনৈতিক ধারা ভবিষ্যতে আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

ঐতিহ্য হারানোর পথে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতি: দলাদলি, মতবিরোধ ও আদর্শিক সংকটে কোণঠাসা বাম আন্দোলন

ঐতিহ্য হারানোর পথে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতি: দলাদলি, মতবিরোধ ও আদর্শিক সংকটে কোণঠাসা বাম আন্দোলন

Update Time : ০৪:৫৭:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

একসময় বাংলাদেশের গণআন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল কমিউনিস্ট আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের অবদান ইতিহাসের অংশ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই ঐতিহ্য আজ অনেকটাই ম্লান। আদর্শিক বিভক্তি, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, দলাদলি, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং জনসম্পৃক্ততার সংকটে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতি এখন অস্তিত্বের প্রশ্নের মুখোমুখি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের বাম রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের নিজেদের ভেতরের বিভাজন। একই আদর্শে বিশ্বাসী একাধিক দল, উপদল ও প্ল্যাটফর্মে বিভক্ত হওয়ায় গণভিত্তি যেমন ক্ষয় হয়েছে, তেমনি দুর্বল হয়েছে আন্দোলনের ধারাবাহিকতাও। মতাদর্শগত মতপার্থক্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে, যা নতুন নেতৃত্বের বিকাশ এবং সাংগঠনিক সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নিয়েও বিতর্ক কম নয়। সমালোচকদের অভিযোগ, দলটি অতীতের শ্রেণিসংগ্রামভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে সংসদীয় ও সংস্কারমুখী রাজনীতিতে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে দলটির বক্তব্য, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও জনগণের দৈনন্দিন অধিকার আদায়ের লড়াইই বর্তমান কৌশল।
বাস্তবতা হলো, একসময়ের প্রভাবশালী বাম রাজনীতি আজ জাতীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে কার্যত প্রান্তিক। শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র আন্দোলন এবং কৃষক সংগঠনেও তাদের প্রভাব আগের তুলনায় কমেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে বাম রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান সাফল্য দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংকটের জন্য একক কোনো কারণকে দায়ী করা কঠিন। তবে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে আসে
দীর্ঘদিনের দলাদলি ও নেতৃত্বের কোন্দল সংগঠনগুলোর শক্তি ক্ষয় করেছে।
মতাদর্শগত বিভক্তি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সম্ভাবনাকে দুর্বল করেছে।
জনগণের বাস্তব অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে কার্যকর রাজনৈতিক উপস্থিতি কমে যাওয়ায় জনভিত্তি সংকুচিত হয়েছে।
পরিবর্তিত অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন সাংগঠনিক কৌশল ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ব্যর্থতা বাম রাজনীতিকে আরও প্রান্তিক করেছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐতিহ্য নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ। কিন্তু সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে অতীতের গৌরবের ওপর নির্ভর না করে আত্মসমালোচনা, সাংগঠনিক ঐক্য, নেতৃত্বের নবায়ন এবং জনগণের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে আরও গভীর সংযোগ স্থাপন করতে হবে। অন্যথায় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই রাজনৈতিক ধারা ভবিষ্যতে আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।