মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আরিচা নদী বন্দরের শুল্ক আদায় কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে বিআইডব্লিউটিএ (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ) এর ইজারা বিজ্ঞপ্তির শর্ত ভঙ্গের মহোৎসব চলছে। সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের ইজারাদার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স মুবিন ট্রেডার্স’-এর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অবৈধ টোল আদায় এবং অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতি সপ্তাহের হাটের দিন (শুক্রবার ও মঙ্গলবার) সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের জিম্মি করে হাজার হাজার টাকা পকেটে ভরছে ইজারাদার চক্রটি।
সরেজমিনে আরিচা পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নদীপথে ট্রলার ও নৌযানে করে শত শত গরু-ছাগল নিয়ে ঘাটে আসছেন ব্যবসায়ীরা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, নদীপথে আসা এসব পশু ঘাটে নামানোর সময় সরকার নির্ধারিত শুল্ক বা টোল আদায় করার কথা মেসার্স মুবিন ট্রেডার্সের। কিন্তু এই শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে প্রথম অনিয়ম।
হাটে আসা একাধিক ক্রেতা ও বিক্রেতা এই প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেন, নদীপথে আসা প্রতিটি ছাগলের জন্য সরকারি শুল্ক ৭ টাকা নির্ধারিত থাকলেও ইজারাদারের লোকজন আদায় করছে ১০ টাকা। প্রতিবারই ‘খুচরা টাকা নেই’ এমন ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে এই বাড়তি ৩ টাকা রেখে দেওয়া হচ্ছে।
হাট কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতি হাটে ৩ থেকে ৪ শত ছাগল বিক্রি হয়ে থাকে। সেই হিসাবে শত শত ছাগল থেকে এভাবে নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রতি হাটের দিন অতিরিক্ত হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, রসিদ দিয়ে এই অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন চান ও ফোরকান নামে দুই ব্যক্তি। অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারা এই প্রতিবেদকের কাছে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন এবং খুচরা টাকা না থাকার কারণেই বাড়তি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে জানান।
ইজারাদারদের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি ও চাঁদাবাজি লক্ষ্য করা গেছে সড়কপথের পরিবহনকে কেন্দ্র করে। বিআইডব্লিউটিএ-এর ইজারা বিজ্ঞপ্তির শর্তানুযায়ী, মেসার্স মুবিন ট্রেডার্স ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে আরিচা নদী বন্দরের উত্তরে সমেজঘর তেওতা হতে দক্ষিণে বারুলিয়া ধুতরাবাড়ী মৌজার ১০০০ গজ ভাটি পর্যন্ত বন্দর সীমানাভুক্ত লঞ্চঘাট এবং বন্দর সংলগ্ন এলাকায় কেবল নৌযান হতে বার্ডিং চার্জ আদায় এবং মালামাল উঠানো-নামানোর জন্য শুল্ক আদায় করতে পারবে। শর্তে স্পষ্ট বলা আছে, বিআইডব্লিউটিসি’র ফেরিসমূহের বার্ডিং চার্জ এবং ফেরিতে যানবাহন চলাচলকারী মালামালের এলএসসি (Landing and Shipping Charge) ব্যতীত এই ইজারা কার্যকর হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, হাটে কেনাবেচা হওয়ার পর কোনো পশু যদি পুনরায় নদীপথে ট্রলার বা নৌযানে করে অন্য কোথাও নেওয়া হয়, তবেই কেবল ইজারাদার শুল্ক দাবি করতে পারবেন। কিন্তু স্থল বা সড়কপথে ট্রাক, মিনিট্রাক কিংবা পিকআপ ভ্যানে করে যেসব গরু-ছাগল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেগুলোর ওপর টোল আদায়ের কোনো আইনগত অধিকার ইজারাদারের নেই।
অথচ বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে, হাটের পাশে সড়কপথে দাঁড়ানো ট্রাক বা পিকআপে যখন ব্যবসায়ীরা পশু তুলছেন, তখন ইজারাদারের লোকজন গিয়ে সরকারি নিয়মের ভুলভাল ব্যাখ্যা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জোর-জবরদস্তি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে সড়কপথের এসব যানবাহন থেকেও অবৈধভাবে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হচ্ছে। রসিদ দিয়ে কিংবা রসিদ ছাড়া অতিরিক্ত টাকা প্রতি হাটের দিন প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে লুটে নিচ্ছে এই চক্র।
সরকারি শর্ত ভঙ্গ ও অবৈধভাবে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স মুবিন ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী মো. মনিউর জাহিদ খান অনিয়মের পক্ষে সাফাই গেয়ে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বলেন, “আপনি আমার বিরুদ্ধে যত পৃষ্ঠা পারেন, লেখেন। তার জবাব আমাদের কাছে আছে।” এ বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য আছে কি না জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “সন্ধ্যায় আসেন কথা বলবোনে।”
এই সুনির্দিষ্ট অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ’র আরিচা নদী বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা সুব্রত রায় বলেন, “ইজারাদাররা কেবল নৌপথে আসা-যাওয়া করা মালামাল বা পণ্যের শুল্ক নিতে পারবেন। সড়কপথে কোনো পণ্যের শুল্ক আদায় করা সম্পূর্ণ অবৈধ। যারা এই নিয়মের বাইরে গিয়ে টোল আদায় করছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিষয়টি নিয়ে শিবালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, “বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। সরকারি নিয়মের কোনো রকম ব্যত্যয় বা জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নিজস্ব প্রতিবেদক : 


















