রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে ৯০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে মারধর, প্রাণনাশের হুমকি এবং তাঁর সম্পত্তি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর বৃদ্ধার একমাত্র ছেলে, দুই নাতি ও আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
নিজের ও দুই নাতনীর জীবন এবং সম্পত্তির নিরাপত্তা চেয়ে বালিয়াকান্দি থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন কুলসুম বেগম নামের ওই বৃদ্ধা। গত ১১ সেপ্টেম্বর তিনি থানায় অভিযোগটি করেন।
কুলসুম বেগম বালিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের ওয়াপদা এলাকার মৃত পরশ উল্লাহর স্ত্রী।
দীর্ঘদিনের নির্যাতনের অভিযোগ
থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে কুলসুম বেগম দাবি করেন, প্রায় ৪০ বছর আগে থেকেই তাঁর একমাত্র ছেলে ইমান আলী শেখ তাঁকে নিয়মিত মারধর ও প্রাণনাশের চেষ্টা করতেন। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি নিজের নামে পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৪৬ শতাংশ জমি কিনে সেখানে ঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন।
অভিযোগে তিনি জানান, ওই জমির বিএস খতিয়ান নম্বর ৫৫৭ এবং এসএ রেকর্ড তাঁর নিজের নামে রয়েছে।
বৃদ্ধার অভিযোগ, তাঁর ছেলে ও নাতিরা নিয়মিত কোনো কাজকর্ম করেন না এবং তাঁকে ভরণপোষণও দেন না। বরং চিকিৎসা ও পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন সময় টাকা নেওয়া হয়। একইভাবে তাঁর দুই নাতনী ফারজানা আক্তার ও শান্তা খাতুনের কাছ থেকেও অভাব-অনটন এবং সন্তানের চিকিৎসার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি।

সম্পত্তি বিক্রি ও দখলের চেষ্টার অভিযোগ
কুলসুম বেগমের দাবি, তাঁর স্বামীর জীবদ্দশায় কষ্ট করে গড়ে তোলা সম্পত্তির অধিকাংশই ছেলে ও নাতিরা বিক্রি করে দিয়েছেন। এমনকি ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকেও জমি বিক্রি করে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁর ভোগদখলে থাকা বসতভিটায় মোট ৪৬ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে আর্থিক সহযোগিতার অনুরোধে প্রায় ১৪ শতাংশ জমি তাঁর দুই নাতনী ফারজানা আক্তার ও শান্তা খাতুনের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন তিনি। এ সময় ছেলে ইমান আলী এবং নাতি মিলন ও ইমরান দলিলের সাক্ষী ও শনাক্তকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ওই জমির বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন বৃদ্ধা।
ঘর বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় লাথি, দা নিয়ে হুমকির অভিযোগ
অভিযোগে কুলসুম বেগম আরও উল্লেখ করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর নাতি মিলন শেখ মাদকের টাকা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ফারজানা আক্তারের নামে থাকা জমিতে নির্মিত একটি বসতঘর বিক্রির চেষ্টা করেন।
খবর পেয়ে কুলসুম বেগম ও তাঁর দুই নাতনী সেখানে গিয়ে ঘরটি বিক্রি না করার অনুরোধ করলে মিলন শেখ তাঁকে বুকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেন বলে অভিযোগ করেন বৃদ্ধা।
এ সময় ইমরান শেখ একটি ধারালো দা নিয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে এসে প্রাণনাশের হুমকি দেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগেও হুমকি ও মারধরের ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে ২০১৬ সালে বালিয়াকান্দি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন কুলসুম বেগম। অভিযোগে ওই জিডির নম্বর ৭৩২ উল্লেখ করা হয়েছে।
রেকর্ড সংশোধনের মামলার অভিযোগ
সম্প্রতি নিজের নামে রেকর্ডীয় ও ভোগদখলীয় সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরি করে রেকর্ড সংশোধনের মামলা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন কুলসুম বেগম।
তিনি জানান, এ-সংক্রান্ত মামলার নোটিশ গত ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর ও দুই নাতনীর নামে আদালত থেকে পাঠানো হয়েছে।
বৃদ্ধার আরও অভিযোগ, গত দুই দিন ধরে এবং ১১ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে তাঁর নাতি মিলন শেখ পুকুরে মাছ ধরছেন। একই সময়ে ইমরান শেখকেও সেখানে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। প্রাণনাশের হুমকির কারণে নিজের সম্পত্তিতেও যেতে পারছেন না বলে দাবি করেছেন তিনি।
‘সম্পত্তির জন্য আমাকে যেকোনো সময় হামলা করা হতে পারে’
কুলসুম বেগমের আশঙ্কা, ছেলে ও দুই নাতির উল্লেখযোগ্য আয়-রোজগার না থাকায় এবং তিনি জীবিত থাকায় সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে তাঁকে যেকোনো সময় হামলার শিকার হতে হতে পারে।
তাই নিজের ও দুই নাতনীর জীবন এবং সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
কুলসুম বেগমের নাতনী শান্তা খাতুন বলেন, “আমরাই নানীর ভরণপোষণ করি। তাঁর ছেলে ইমান আলী কিংবা নাতি মিলন ও ইমরান কোনো ধরনের ভরণপোষণ দেন না। বরং বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে নানীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। মামা ও তাঁর ছেলেরা নিজেদের সম্পত্তি বিক্রি করে এখন নিঃস্ব হয়েছেন। বর্তমানে নানী ও আমাদের সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করছেন।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মিলন শেখ অতীতেও তাঁর দাদীকে মারধর করেছেন এবং ইমরান শেখ তাঁকেও মারধরের চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, “অজ্ঞাত কিছু লোকের প্ররোচনায় জমির লোভে তাঁরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন।”
বৃদ্ধার দাবি, ‘আমাকে ভিটাছাড়া করার চেষ্টা চলছে’
কুলসুম বেগম বলেন, “আমাকে নিয়মিত মারধর করে বাড়িছাড়া করা হয়েছে। আমার ছেলে কোনো কাজকর্ম না করে সব সম্পত্তি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছে। তার চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচও আমার কাছ থেকেই নেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, “সবশেষ আমার বসতভিটার প্রায় ১৪ শতাংশ জমি দুই নাতনী ফারজানা ও শান্তার নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার সময় আমার ছেলে ইমান আলী, মিলন ও ইমরান প্রায় অর্ধকোটি টাকা নিয়েছে। এখন সেই টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় একই খতিয়ানের জমি নিয়ে আবার রেকর্ড সংশোধনের মামলা করে আমাকে ভিটাছাড়া করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
ছেলে বললেন, ‘আমার ছেলে মিলন সব জানে’
অভিযোগের বিষয়ে কুলসুম বেগমের ছেলে ইমান আলী শেখের সঙ্গে কথা হলে তিনি মায়ের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ইমান আলী শেখ বলেন, “আমি কিছু বলতে পারব না। আমার ছেলে মিলন সব জানে, ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
পুলিশের আশ্বাস, তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা
বালিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রব তালুকদার বলেন, “বৃদ্ধার অভিযোগের বিষয়টি অবগত আছি। তিনি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগটি দ্রুত তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মোঃ আজমল হোসেন, রাজবাড়ী বালিয়াকান্দি প্রতিনিধি। 

















