মীর আফরোজ জামান:
বাংলাদেশের সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান বুধবার সেনা সদরে অফিসারদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত অনুষ্ঠানে বর্তমান ইউনুস সরকারের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। বৈঠকে বক্তব্যে তিনি বলেছেন,
মানবিক করিডরের মত স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার বর্তমান সরকারের নেই !
তিনি বলেন, শুধুমাত্র একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারই যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ পূর্বক এরূপ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তিনি আরো বলেন যে, করিডর বিষয়ে সরকার কি ভাবছেন অথবা জাতিকে একটি ”প্রক্সি ওয়ারের” দিকে ঠেলে দিচ্ছে কিনা, এই বিষয়ে সরকার স্পষ্টভাবে কিছুই জানাচ্ছে না। অনুষ্ঠানের পরের অংশে এক অফিসারের প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ”দে আর উইল বি নো করিডোর”।
কর্তব্যরত ব্যতীত দেশের সকল সেনানিবাস ও জাতিসংঘ মিশনে মোতায়েন সকল সেনা অফিসার এই অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। প্রথম অংশে সেনাপ্রধান অফিসারদের উদ্দেশ্যে সকাল সাডে ১০ টায় প্রায় ৩০ মিনিট তিনি বক্তব্য রাখেন এবং এরপর প্রায় ০১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট অফিসারদের প্রশ্নের উত্তর দেন।
সাধারণভাবে সেনাপ্রধান কে বেশ ক্লান্ত, খানিকটা হতাশ ও স্বভাববিরুদ্ধভাবে উত্তেজিত মনে হয়েছে।
সেনা প্রধান তার প্রাথমিক বক্তব্যে তিনি নিরলস ভাবে কাজ করে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য সেনাবাহিনীর সকল সদস্যকে অভিবাদন জানান। তবে বিভিন্ন কারণে দেশের শান্তি শৃঙ্খলা সহ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি হতাশা ব্যক্ত করেন।
সার্বিকভাবে দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং সময়ের সাথে পরিস্থিতির আরো অবনতি হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন সহ সকল সংস্থা ভেঙে পড়েছে এবং পুনর্গঠিত হতে পারছে না। শুধুমাত্র সশস্ত্র বাহিনী এখনো পর্যন্ত টিকে আছে এবং দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
৫ ই আগস্ট এর পর হতে আজ পর্যন্ত দেশের সার্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সেনাবাহিনীর অক্লান্ত ও নিঃস্বার্থ ভূমিকা সত্বেও বিভিন্ন মহল হতে সেনাবাহিনী ও সেনা প্রধানকে টার্গেট করা হচ্ছে উল্লেখ করে সেনা প্রধান হতাশা ব্যক্ত করেন।
তিনি আরো উল্লেখ করে বলেন, দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল পরিস্থিতিকে আরো অবনতি ঘটাতে যাচ্ছে যাতে করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করতে পারে।
জাতিসংঘ কর্তৃক জুলাই-আগস্ট বিষয়ে যে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে তাতে সেনাবাহিনীর কোন বক্তব্য নেয়া হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে জাতিসংঘের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানতে পারেন যে, জাতিসংঘ সেনাবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করতে চাইলেও বর্তমান সরকার জাতিসংঘকে সে সুযোগ দেয়নি।
সংস্কার সহ বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বা কিভাবে নিচ্ছে সে বিষয়ে দেশবাসীর পাশাপাশি তিনি এবং সেনাবাহিনী অবগত নন বলে তিনি হতাশা ব্যক্ত করেন। পরবর্তীতে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রথম দিন থেকেই প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে তিনি বারংবার সরকারকে অনুরোধ করেছেন। তবে সরকার অনুরূপ সংস্কারের বিষয়ে সত্যিকার অর্থে সিরিয়াস নয় ।
মানবিক করিডরের মত স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার বর্তমান সরকারের নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শুধুমাত্র একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারই যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ পূর্বক এরূপ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তিনি আরো বলেন যে, করিডর বিষয়ে সরকার কি ভাবছেন অথবা জাতিকে একটি ”প্রক্সি ওয়ারের” দিকে ঠেলে দিচ্ছে কিনা, এই বিষয়ে সরকার স্পষ্টভাবে কিছুই জানাচ্ছে না। অনুষ্ঠানের পরের অংশে এক অফিসারের প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন,”দে আর উইল বি নো করিডোর” ।
একইভাবে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর এর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার এই সরকারের নেই বলে সেনা প্রধান উল্লেখ করেন।
একের পর এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, এই বিষয়েও সরকারের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
গত ২০ মে ২০২৫ তারিখ রাতে অনুষ্ঠিত সভায় এর পূর্ব রাতে সেনা ভবনে কোন গোপন সভা হয়েছিল কিনা এ বিষয়ে তিনি সরকার কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হন বলে সেনাপ্রধান উল্লেখ করেন। এ প্রেক্ষিতে তিনি বলেন যে, ”সেনাপ্রধান যে কোন সময়ে অর্পিত দায়িত্বের খাতিরে সভা আয়োজন করতে পারেন এবং এছাড়া সেনাপ্রধানকে যে সাংবিধানিক অধিকার দেয়া আছে তাতে করে তার কোন ষড়যন্ত্রমূলক সভা করার প্রয়োজনীয়তা নেই”।
সেনা প্রধান বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশ ও জনগণের কোনরকম ক্ষতি হয় এমন কোন কাজ করবে না এবং কাউকেই এমন কোন কাজ করতে দেবে না ।
গত নয় মাস ধরে সেনাপ্রধান হিসেবে অভিভাবকহীন হয়ে রয়েছেন বলে তিনি কয়েকবার উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন যে, ”আমি একটি চাতক পাখির মত একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের দিকে তাকিয়ে আছি। একটি নির্বাচিত সরকার সেনাবাহিনীর জন্য অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এবং যার ফলশ্রুতিতে সার্বিকভাবে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে”।
যথাশীঘ্র সম্ভব একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আসন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে সততার সাথে নিরপেক্ষ থেকে যথাযথ দায়িত্ব পালন করবার জন্য ও তিনি নির্দেশনা প্রদান করেন।
এত দীর্ঘ সময় ধরে সেনা সদস্যবৃন্দ শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়ন রয়েছে যা সার্বিকভাবে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই তিনি একটি নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর যথাশীঘ্র সম্ভব সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেবেন বলে উল্লেখ করেন। এটা না করতে পারলে বিদ্যমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও প্রতিবেশী অঞ্চলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেনা প্রধান সকলকে অর্পিত দায়িত্ব সর্বোচ্চ কর্তব্য পরায়ণতা ও আনুগত্যের সাথে পালন করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। পরবর্তীতে এক অফিসারের প্রশ্নের উত্তরে তিনি মজলুমদের অশ্রুজল যাতে না ঝরে এবং মজলুমদের অধিকার রক্ষায় সুনির্দিষ্ট ভাবে কাজ করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন।
১৯৪৭ হতে ১৯৭১ এ বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে স্বল্প পরিসরে পড়ানো হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে একজন অফিসার উল্লেখ করেন। উক্ত অফিসার এর পাশাপাশি ৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে অফিসারদের জ্ঞান অর্জন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন। সেনাপ্রধান এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
সংস্কার কার্যক্রম সমূহের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেনাবাহিনীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থাকা অবশ্য প্রয়োজন বলে একজন অফিসার মত প্রকাশ করেন। তবে এ বিষয়ে সেনাপ্রধান বিশেষ কোন মত প্রকাশ করেননি।
সহযোদ্ধা প্লাটফর্ম এর বিষয়ে উল্লেখ করে একজন অফিসার সেনাবাহিনী হতে বরখাস্ত সেনা সদস্যদের অপরাধসমূহ আইএসপিআর এর মাধ্যমে জাতিকে জানানোর প্রস্তাব করেন। মহান আল্লাহ অন্যদের দোষ গোপন রাখার নির্দেশনা প্রদান করেছেন বলে এখনো পর্যন্ত এরূপ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে সেনাপ্রধান উল্লেখ করেন। তবে এ বিষয়টি সহ্যের সীমা অতিক্রম করলে এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সবশেষে সেনা প্রধান সকলকে ইউনাইটেড এবং অর্পিত দায়িত্ব ও দেশপ্রেমের আদর্শে অনুপ্রানিত থাকার নির্দেশনা প্রদান করেন। নিজ অবস্থান ও আদর্শে অবিচল থাকলে কোন মহলই সেনাবাহিনী ও দেশের কোন ক্ষতি করতে পারবে না বলে সেনা প্রধান উল্লেখ করেন।
Reporter Name 


















