মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঠিক বিপরীত পাশে উথলিতে অবস্থিত ‘মা ডায়াগনস্টিক সেন্টার’। বাইরে ঝুলানো সাইনবোর্ডে উন্নত চিকিৎসার আশ্বাস দেওয়া হলেও ভেতরে চলছে এক অসাধু চক্রের চরম নৈরাজ্য ও চিকিৎসাসেবার নামে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা। সরকারি আইন ও লাইসেন্সের শর্তকে তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. রহিজ উদ্দিন একাই সামলাচ্ছেন প্যাথলজি, ইসিজি থেকে শুরু করে রেডিয়েশন-ঝুঁকিপূর্ণ ডিজিটাল এক্স-রে কার্যক্রম। একই সাথে শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন সরকারি চিকিৎসকের সাথে অনৈতিক কমিশন বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সাধারণ রোগীদের পকেট কাটা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একশ্রেণীর সরকারি চিকিৎসকের চাঞ্চল্যকর অনিয়মের চিত্র। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এসব চিকিৎসক সরকারি ডিউটির পাশাপাশি মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়মিত প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। ভুক্তভোগী রোগীদের অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসকেরা সাধারণ রোগীদের দেখার পর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন ছাড়াই ইচ্ছামতো একগাদা প্যাথলজিক্যাল ও ইমেজিং টেস্ট প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন।
পরিকল্পিতভাবেই রোগীদের বাধ্য করা হয় মা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকেই সেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে। এরপর রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ থেকে নির্দিষ্ট হারে মোটা অঙ্কের কমিশন পৌঁছে যায় ওই চিকিৎসকদের পকেটে।
শুধু তা-ই নয়, প্রতিদিন সকাল ও দুপুরে শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যখন রোগীদের উপচে পড়া ভিড় থাকে, তখন সরকারি হাসপাতালের ডিউটি ফাঁকি দিয়ে এই চিকিৎসকদের ‘অন-কলে’ মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডেকে এনে চুক্তিভিত্তিক আলট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। ফলে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি কেবল ‘ক্যাটাগরি-সি’ (Category-C) বা একটি সাধারণ প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরির অনুমোদন পেয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী সি-ক্যাটাগরির সেন্টারে শুধুমাত্র রক্তের সাধারণ পরীক্ষা (CBC, Hb%), প্রস্রাব-মল এবং ডেঙ্গু বা টাইফয়েডের মতো প্রাথমিক টেস্ট করার অনুমতি থাকে।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, রহিজ উদ্দিন সি-ক্যাটাগরির নীতিমালার তোয়াক্কা না করে কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই এক্স-রে, ইসিজি ও আলট্রাসনোগ্রামের মতো রেডিওলজি ও ইমেজিং সেবা চালু রেখেছেন। অতি পরিচিত এই চিকিৎসা সরঞ্জাম এক্স-রে মেশিনের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (AERB) থেকে রেডিয়েশন লাইসেন্স ও সনদপ্রাপ্ত এক্স-রে টেকনিশিয়ান থাকা বাধ্যতামূলক হলেও তার কিছুই নেই মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। নেই ন্যূনতম রেডিয়েশন সুরক্ষাব্যবস্থাও।
ল্যাবের সরেজমিন চিত্রে দেখা যায়, মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আসা রোগীদের রক্ত সংগ্রহ, প্যাথলজিক্যাল টেস্ট প্রসেসিং, ইসিজি করা এমনকি এক্স-রে রুমে ঢুকে এক্স-রে শুট করা- সবকিছুই একা হাতে করছেন মালিক রহিজ উদ্দিন। তাকে সহযোগিতার জন্য ২-৩ জন কর্মচারী নিয়োজিত থাকলেও কোনো সরকারি বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে ডায়াগনস্টিক ল্যাবে কাজ করার ন্যূনতম সনদ বা অনুমোদন তাদের নেই।
প্রতিষ্ঠানটিতে বিএমডিসি (BMDC) নিবন্ধিত কোনো বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট বা রেডিওলজিস্ট ডাক্তার না থাকা সত্ত্বেও, মনগড়া ও মানহীন রিপোর্ট তৈরি করে প্রতিনিয়ত রোগীদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। ডিজিটাল এক্স-রে নিজে করে অনলাইনে অন্য ডাক্তার দিয়ে রিপোর্ট করানোর দাবি করলেও, সাংবাদিকরা সেই ডাক্তারের তথ্য বা বৈধ কাগজপত্র দেখতে চাইলে রহিজ উদ্দিন কোনো নথি প্রদর্শন করতে পারেননি।
অনুসন্ধানে সাংবাদিকরা সোমবার দুপুরে মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে লাইসেন্স ও নথিপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে মালিক রহিজ উদ্দিন তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
পরে সেন্টারের নোটিশ বোর্ডে সাটানো নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়- স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স (DGHS): ‘ক্যাটাগরি-সি’ লাইসেন্সটির (মেয়াদ শেষ: ৩০ জুন, ২০২৪) নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেছে। নবায়নের কোনো কপি নোটিশ বোর্ডে পাওয়া যায়নি। সেন্টারটিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কোনো ফায়ার লাইসেন্স নেই, এমনকি জরুরি অগ্নিনির্বাপক কোনো সরঞ্জামও রাখা হয়নি। পরিবেশ ছাড়পত্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও দেখা মিলেনি। বর্জ্য অপসারণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র পাওয়া যায়নি। ল্যাবে ব্যবহৃত বিষাক্ত সিরিঞ্জ, ব্যবহৃত রক্তের কন্টেইনার, ইউরিন কাপ ও ব্লাড-মাখানো তুলা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ধ্বংস না করে সাধারণ স্থানে ফেলে রাখা হচ্ছে, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
অনিয়ম ও মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজের বিষয়ে জানতে চাইলে মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মো. রহিজ উদ্দিন উদাসীনভাবে বলেন, “এখানকার কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারেরই কাগজপত্র ঠিক নেই, আপনারা আগে তাদের গিয়ে ধরেন।”
নিজের প্রতিষ্ঠানের বেআইনি এক্স-রে কার্যক্রম ও মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সের সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। একপর্যায়ে অসৎ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দিয়ে বিকেলে সাংবাদিকদের গোপনে আলাদাভাবে দেখা করার প্রস্তাব দেন তিনি।
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ সিভিল সার্জন ডাঃ আইভি ফেরদৌসী বলেন, যদি কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের মালিক নিয়ম নিয়মবহির্ভূত বাইরে যদি কোন মালিক পক্ষ, অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন তাহলে, সরজমিনে গিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে
চিকিৎসাসেবার নামে এমন চরম অব্যবস্থাপনা, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট লিখে সরকারি ডাক্তারদের কমিশন বাণিজ্য এবং অননুমোদিত এক্স-রে বন্ধে দ্রুত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরমাণু শক্তি কমিশন ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জরুরি অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী রোগীরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক : 


















