মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আরিচা-পাটুরিয়া লঞ্চঘাট, ফেরীঘাট ও বন্দর এলাকায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নদী পারাপারে সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত শুল্ক বা ‘ঘাট ট্যাক্স’ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) অনুমোদিত ইজারাদার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স মুবিন ট্রেডার্স’-এর বিরুদ্ধে এই বেপরোয়া টোল আদায়ের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে স্থানীয় প্রশাসন ও তদারকি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া মেসার্স মুবিন ট্রেডার্সের একটি রসিদে (নং- ১৭৯৫২) দেখা যায়, ৪টি কার্টনে মাত্র ১০ কেজি মালামালের বিপরীতে ৮০ টাকা শুল্ক আদায় করা হয়েছে। অথচ ঘাটে জনপ্রতি ট্রলার (ইঞ্জিনচালিত নৌকা) ভাড়া মাত্র ১০ টাকা। অর্থাৎ যাতায়াত ভাড়ার চেয়ে ৮ গুণ বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে সামান্য মালামাল পারাপারেই।
ফেসবুক পোষ্টটিতে একজন কমেন্টকারীর দাবি, ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. মনিউর জাহিদ খান শিবালয় উপজেলা শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি। তাকে আওয়ামীলীগের দোসর আখ্যা দিয়ে কমেন্ট করেছেন যুবদলের নেতা। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ঘাটে একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলেন তিনি। পটপরিবর্তনের পরও তার এই সিন্ডিকেট বহাল থাকায় স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের ‘মানিকগঞ্জ উন্নয়নের পথে’ পেজে প্রথম এই অনিয়মের চিত্র ও রসিদটি পোস্ট করা হয়, যার অ্যাডমিন স্থানীয় সাংবাদিক আকাশ চৌধুরী। পোস্টটি জনসমক্ষে আসার পর থেকেই ইজারাদার ও তার ঘনিষ্ঠ মহল থেকে পোস্টটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য দফায় দফায় নানা তদবির করা হয়। তবে তাতে সাড়া না দেওয়ায় উল্টো অনিয়ম ঢাকার চেষ্টা ও সাংবাদিকের ওপর দায় চাপানোর অপকৌশল শুরু করেছে ইজারাদার চক্র।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইজারাদারের ব্যবসায়িক অংশীদার মো. বাবুল খান ওই পোস্টটির কমেন্টে প্রকাশ্যে সাংবাদিক আকাশ চৌধুরীকে ‘সাংঘাতিক’ আখ্যা দিয়ে চূড়ান্ত অবমাননাকর মন্তব্য করেন এবং সাইবার ক্রাইম মামলায় ফাঁসানোর প্রকাশ্য হুমকি দেন।
বাবুল খান কমেন্ট লিখেছেন, ‘সাংবাদিক ভাই চাঁদা একটু বেশী চেয়েছিল টাকার অংকটা মনে হয় কম হয়েছে তাই না আকাশ ভাই।’ অর্থাৎ তিনি দাবি করেন, সাংবাদিককে ‘কম টাকা’ দেওয়ায় তিনি এই পোস্ট করেছেন।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন- ইজারাদার যদি কোনো নিয়মের ব্যত্যয় না-ই করে থাকেন, তবে সাংবাদিককে টাকা দিতে চাওয়া বা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য অনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করা হয়েছিল কেন?
অন্যদিকে, ইজারাদারের ভাই ও ব্যবসায়িক অংশীদার মাইনুল জাহিদ আল চিশতী দাবি করেছেন, রসিদে ‘১০ কেজি’ লেখাটি তাদের নয় এবং এটি বানোয়াট।
ডিজিটাল ডিটেক্টর ও মেটাডাটা বিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, রশিদটির লেখা ও তথ্যসমূহ সঠিক। বিশ্লেষণ ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ বলছে-রসিদটি মোটেও ভুয়া নয় এবং ‘১০ কেজি’ লেখাটি পরেও যোগ করা হয়নি। রসিদের তারিখ, বিবরণ, টাকার পরিমাণ ও নিচের স্বাক্ষর একই কলমের কালি, একই চাপ ও একই ব্যক্তির হাতের লেখায় একই সময়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, নিজেদের অপরাধ ঢাকতেই ইজারাদারের লোকজন এখন রসিদের লেখা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
এছাড়া ইজারাদারের রাজনৈতিক পরিচয়ের সত্যতা তুলে ধরায় এক কমেন্টকারীকে ‘হাটে চাকরি না পাওয়ায়’ ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে মূল বিষয় থেকে নজর সরানোর চেষ্টা চালান মাইনুল জাহিদ।
ঘাটে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, অতিরিক্ত টাকা না দিলে বা প্রতিবাদ করতে গেলে ইজারাদারের লোকজনের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে তীব্র প্রতিবাদ। বাছেদুর রহমান নামে এক ক্ষুব্ধ নাগরিক লিখেছেন, “যাহারা এই দুর্নীতির সাথে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। প্রয়োজনে ইজারা বাতিল করা হোক।” শাহিনুর রহমান নামের অন্য এক স্থানীয় বাসিন্দা ইজারাদারদের চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
সুনির্দিষ্ট প্রমাণের বিষয়ে জানতে চাইলে ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. মনিউর জাহিদ খান উদাসীনতা ও ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেন, “ফেসবুকে ওই বিষয়ে বাদী কে? আগে বাদীকে নিয়ে আসেন, তারপর আপনাদের সঙ্গে কথা বলবো। যদি আমার জেল-ফাঁস হয় হবে।” রসিদের কার্বন কপি বা অফিস কপি দেখিয়ে সত্যতা প্রমাণের সুযোগ থাকলেও, তিনি তা না করে ভিত্তিহীন অজুহাত তুলে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
এই বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ আরিচা নদী বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা সুব্রত রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “আমি মিটিংয়ে আছি, পরে ফোন দিচ্ছি।”
তদারকি প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিকভাবে ম্যানেজ করেই ইজারাদারের লুটপাট চলছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। অভিযোগের পাহাড় ও স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ-এর এই নিষ্ক্রিয়তা ইজারাদারদের বেপরোয়া মনোভাবকে আরও উসকে দিচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অবিলম্বে এই অবৈধ টোল আদায় বন্ধ করে ইজারাদারের লাইসেন্স পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক : 
















