ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, নেই ফিটনেস সনদ কিংবা বিআরটিএর অনুমোদন। স্থানীয় গ্যারেজে পুরনো পিকআপের পেছনে ধাতব খাঁচা আর কাঠের বেঞ্চ বসিয়ে রূপান্তর করা হয়েছে এসব যানবাহন। খাতাকলমে পুরোপুরি অবৈধ হলেও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর থেকে কালামপুর অংশে প্রতিদিন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শতাধিক ‘লেগুনা’। আর এই অবৈধ যানকে মহাসড়কে নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ করে দিতে গড়ে উঠেছে হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালী চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট, যাদের পকেটে প্রতি মাসে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিটি লেগুনায় একজন ড্রাইভার ও একজন হেলপার থাকলেও অধিকাংশ চালকেরই নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স। অনভিজ্ঞ চালকদের হাতে গাড়ি থাকায় ব্যস্ততম ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক। দ্রুত ট্রিপ শেষ করার প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে অন্য সব যানবাহনকে তটস্থ থাকতে হয়।
তাছাড়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এ ধরনের রূপান্তরিত যানবাহনের কোনো অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেয় না। মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরনো পিকআপ কিনে স্থানীয় গ্যারেজে বডি মডিফাই করে লেগুনা বানানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী বসার ব্যবস্থা থাকলেও, পোশাক কারখানার ছুটি বা শুরুর মুহূর্তে একেকটি লেগুনায় গাদাগাদি করে এবং পেছনে ঝুলিয়ে ১৬ থেকে ১৮ জন যাত্রী তোলা হয়।
লাইনভিত্তিক চাঁদার হিসাব
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অবৈধ এসব যান চলাচলের জন্য প্রতিদিন দিতে হয় লাইন চাঁদা। কালামপুর ও জোপরা (জয়পুরা) পয়েন্টে এই চাঁদা আদায়ের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে। কালামপুর পয়েন্টে প্রতিদিন প্রতিটি লেগুনা থেকে ৬০ টাকা করে আদায় করেন সোলায়মান ও সুমন।
আর জোপরা (জয়পুরা) পয়েন্টে দৈনিক প্রতি যান থেকে ৩০ টাকা আদায় করেন জুলহাস। এসব চাঁদার পাশাপাশি লেগুনা মালিক সমিতির নাম ভাঙিয়েও আদায় করা হয় চাঁদা।
স্থানীয় চাঁদাবাজদের পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশের নামেও মাসোয়ারা তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। মহাসড়কে চলাচলের অনানুষ্ঠানিক ‘অনুমতি’ হিসেবে প্রতিটি লেগুনা থেকে প্রতি মাসে আদায় করা হয় ২,৫০০ টাকা। এই নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসোয়ারা আবার ভাগ হয়ে দুটি হাইওয়ে পুলিশ থানার নামে তোলা হয়। গোলড়া হাইওয়ে পুলিশ থানা প্রতি গাড়ি থেকে ১,০০০ টাকা। আর সাভার হাইওয়ে পুলিশ থানা প্রতি গাড়ি থেকে ১,৫০০ টাকা।
গাড়িচালকদের কাছ থেকে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে এই মাসোয়ারা তুলে নেন রুহুল, খালেক ও বাবুল নামের কয়েক ব্যক্তি। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে টাকা না দিলে লেগুনাকে মহাসড়কে ট্রিপ বা সিরিয়াল দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সাভারের এক পোশাক কারখানা শ্রমিক বলেন, “বাসে ভিড় থাকে, সময়মতো যাওয়া যায় না বলে বাধ্য হয়েই লেগুনায় উঠতে হয়। কিন্তু পেছনে ঝুলে থাকা আর অনভিজ্ঞ চালকদের রেষারেষিতে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। একটু ভুল হলেই নিশ্চিত দুর্ঘটনা।”
ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকার কথা স্বীকার করে কয়েকজন চালক বলেন, “আমাদের লাইসেন্স বা গাড়ির কোনো কাগজ নাই, এটা সত্য। কিন্তু ফ্রিতে তো আর রোডে গাড়ি চালাই না। প্রতিদিন লাইন চাঁদা আর মাসের ১০ তারিখের মধ্যে পুলিশের আড়াই হাজার টাকা ঠিকই মেটাতে হয়। কামাই কম হলে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা ছাড়া আমাদের উপায় থাকে না।”
লেগুনার একাধিক মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মালিক সমিতির চাঁদা আর পুলিশের মান্থলি সামলে আমাদের ব্যবসায় টিকতেই কষ্ট হয়। নির্দিষ্ট সময়ে মান্থলি না দিলে সাভার বা গোলড়া থানার লোক গাড়ি আটকে রাখে, সিরিয়াল দেয় না। অবৈধ গাড়ি বলে বাধ্য হয়ে তাদের দাবি মেনে নিতে হয়।”
চাঁদা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত রুহুল / বাবুলের কাছে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তারা কোন ব্যক্তি ফোন রিসিভ করেননি।
কালামপুর লেগুনা মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুব এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লেগুনা থেকে মাসে কোন চাঁদা কাটা হয় না আমাদের প্রতিদিন থানায় গাড়ি দিতে হয় এ পর্যন্তই আমার জানা আছে।
মান্থলি আদায়ের বিষয়ে গোলড়া হাইওয়ে থানার ওসি মোঃ সেলিম মাতুব্বর বলেন, “হাইওয়ে পুলিশের নামে চাঁদা বা মাসোয়ারা তোলার কোনো সুযোগ নেই। যদি পুলিশের নাম ভাঙিয়ে রুহুল, খালেক বা বাবুল নামের কেউ টাকা তুলে থাকে, তবে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ফিটনেস বিহীন যান চলাচলের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত মামলা থাকবে।
অন্যদিকে সাভার হাইওয়ে থানার ওসি সওগাতুল আলমকে বিষয়টি নিয়ে জানার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। পরবর্তীতে টেক্সট এর মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলেও তাতে কোন রিপ্লাই আসেনি।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়কে এভাবে প্রকাশ্যে অবৈধ যানবাহনের রাজত্ব এবং ঘুষ-চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কর্মীরা।
ধামরাই এলাকার এক কলেজ শিক্ষক বলেন, “হাইওয়ে পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে লাইসেন্স ছাড়া চালকরা শতাধিক অবৈধ লেগুনা চালিয়ে যাচ্ছে, আর পুলিশ বলছে তারা জানে না-এটা স্রেফ দায় এড়ানো কথা। পুলিশের মাসোয়ারা বাণিজ্যের কারণেই আজ মহাসড়ক সাধারণ মানুষের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। অনতিবিলম্বে এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।”
মানবাধিকারকর্মী ও সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনকারীরা বলেন, “একটি অবৈধ গাড়ি মহাসড়কে নামতে পারাই তো আইনশৃঙ্খলার চরম ব্যর্থতা। তার ওপর যখন লাইসেন্সহীন চালক ও ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দুর্ঘটনা শুধুই সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। হাইওয়ে পুলিশের যেসব সদস্য এই মাসোয়ারার সাথে জড়িত, তাদের বরখাস্ত করে আইনি আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি গ্যারেজগুলোতে অবৈধ রূপান্তর বন্ধে সমন্বিত অভিযান চালানো জরুরি।”
নিজস্ব প্রতিবেদক : 



















