০৫:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আলফাডাঙ্গায় কলেজ ছাত্র নিহতজেরে প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ গ্রামে কলেজছাত্র সুমন শেখ (২৪) হত্যাকাণ্ডের দুই সপ্তাহ পরও থামেনি এলাকার উত্তেজনা। হত্যা মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবির পাশাপাশি এবার প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা, নির্মাণাধীন বিল্ডিং ও ছাদসহ একাধিক বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) সরেজমিনে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারজুড়ে এখনো শোকের মাতম। ছেলে সুমনের মোবাইল ফোনে থাকা ছবিগুলো দেখতে দেখতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা শেফালী বেগম।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। আমার সন্তান আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, কিন্তু আমি যেন ন্যায়বিচার পাই।

গত ২৬ জুন শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার বড়ভাগ পূর্বপাড়ায় উকিল শেখের বাড়ির সামনে পূর্বশত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলায় নিহত হন কলেজছাত্র সুমন শেখ। তিনি বড়ভাগ গ্রামের আলাউদ্দিন শেখের ছোট ছেলে এবং কাশিয়ানী উপজেলার এম.এ. খালেক ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের ছেলে হোসাইন শেখের পরিবারের সঙ্গে সুমনদের বিরোধ চলছিল। ঘটনার দিন কলেজ থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে সুমনের গতিরোধ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে । হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই শামীম শেখ বাদী হয়ে আলফাডাঙ্গা থানায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এজাহারভুক্ত একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এ মামলার আসামিপক্ষ অভিযোগ করেছে, হত্যাকাণ্ডের পর তাদের কয়েকটি বাড়িতে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়। হামলায় বসতবাড়ি, নির্মাণাধীন বিল্ডিং ও বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। পাশাপাশি গবাদিপশু, ধান-চাল ও ঘরের মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের।

সরেজমিনে আব্দুল আলীম শেখ, শাহাদাৎ শেখ, হোসাইন শেখ, উকিল শেখ, রাকিব সর্দার ও আলিম শেখের বাড়িসহ অন্তত আট থেকে ১০টি বাড়িতে ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা যায়। বিভিন্ন ঘরের দরজা-জানালা, আসবাবপত্র, নির্মাণসামগ্রী ও মালামাল তছনছ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

আলিম শেখের স্ত্রী শাপলা বেগম দাবি করেন, তাদের প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, “বাড়িতে হামলা চালিয়ে সবকিছু ভেঙে তছনছ করা হয়েছে। ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্রও নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

অভিযুক্ত হোসাইন শেখের মা ছাহেরা বেগম বলেন, সুমন হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত, তা আমরা জানি না। কিন্তু আমার ছেলেসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরপর আমাদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। আমরা হত্যার বিচারও চাই, আবার আমাদের ক্ষয়ক্ষতিরও বিচার চাই।

মামলার আসামি শাহাদাৎ শেখের স্ত্রী মর্জিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী ঢাকায় ফার্নিচারের কাজ করেন এবং ছেলে চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করেন। ঘটনার সময় তারা কেউ এলাকায় ছিলেন না। তারপরও তাদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। আমাদের বাড়ি ভেঙে গবাদিপশুসহ অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বাড়ি থেকে ১০টি গরু, ১৫টি ছাগল, ধান-চাল এবং বিভিন্ন মূল্যবান আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের না করে আমাদের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।

উকিল শেখের স্ত্রী সাজেদা বেগম বলেন, “হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। আমাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চালসহ প্রয়োজনীয় মালামাল তছনছ করা হয়েছে। আমরা যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, তার বিচার আইনের মাধ্যমে হোক। কিন্তু এভাবে বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষয়ক্ষতির সুষ্ঠু বিচার চাই।

তবে নিহতের ভাই শামীম শেখ ভাঙচুর-লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হত্যার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। আমরা চাই দ্রুত সবাইকে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হোক।

মধুখালী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. আজম খান বলেন, হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে একজন এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।

তিনি আরও বলেন, কোনো অপরাধের প্রতিকার আরেকটি অপরাধ হতে পারে না। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের পাশাপাশি ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

কালকিনিতে ১৪৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সমন্বয় সভা

আলফাডাঙ্গায় কলেজ ছাত্র নিহতজেরে প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

Update Time : ০৮:২৫:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ গ্রামে কলেজছাত্র সুমন শেখ (২৪) হত্যাকাণ্ডের দুই সপ্তাহ পরও থামেনি এলাকার উত্তেজনা। হত্যা মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবির পাশাপাশি এবার প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা, নির্মাণাধীন বিল্ডিং ও ছাদসহ একাধিক বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) সরেজমিনে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারজুড়ে এখনো শোকের মাতম। ছেলে সুমনের মোবাইল ফোনে থাকা ছবিগুলো দেখতে দেখতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা শেফালী বেগম।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। আমার সন্তান আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, কিন্তু আমি যেন ন্যায়বিচার পাই।

গত ২৬ জুন শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার বড়ভাগ পূর্বপাড়ায় উকিল শেখের বাড়ির সামনে পূর্বশত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলায় নিহত হন কলেজছাত্র সুমন শেখ। তিনি বড়ভাগ গ্রামের আলাউদ্দিন শেখের ছোট ছেলে এবং কাশিয়ানী উপজেলার এম.এ. খালেক ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের ছেলে হোসাইন শেখের পরিবারের সঙ্গে সুমনদের বিরোধ চলছিল। ঘটনার দিন কলেজ থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে সুমনের গতিরোধ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে । হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই শামীম শেখ বাদী হয়ে আলফাডাঙ্গা থানায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এজাহারভুক্ত একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এ মামলার আসামিপক্ষ অভিযোগ করেছে, হত্যাকাণ্ডের পর তাদের কয়েকটি বাড়িতে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়। হামলায় বসতবাড়ি, নির্মাণাধীন বিল্ডিং ও বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। পাশাপাশি গবাদিপশু, ধান-চাল ও ঘরের মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের।

সরেজমিনে আব্দুল আলীম শেখ, শাহাদাৎ শেখ, হোসাইন শেখ, উকিল শেখ, রাকিব সর্দার ও আলিম শেখের বাড়িসহ অন্তত আট থেকে ১০টি বাড়িতে ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা যায়। বিভিন্ন ঘরের দরজা-জানালা, আসবাবপত্র, নির্মাণসামগ্রী ও মালামাল তছনছ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

আলিম শেখের স্ত্রী শাপলা বেগম দাবি করেন, তাদের প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, “বাড়িতে হামলা চালিয়ে সবকিছু ভেঙে তছনছ করা হয়েছে। ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্রও নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

অভিযুক্ত হোসাইন শেখের মা ছাহেরা বেগম বলেন, সুমন হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত, তা আমরা জানি না। কিন্তু আমার ছেলেসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরপর আমাদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। আমরা হত্যার বিচারও চাই, আবার আমাদের ক্ষয়ক্ষতিরও বিচার চাই।

মামলার আসামি শাহাদাৎ শেখের স্ত্রী মর্জিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী ঢাকায় ফার্নিচারের কাজ করেন এবং ছেলে চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করেন। ঘটনার সময় তারা কেউ এলাকায় ছিলেন না। তারপরও তাদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। আমাদের বাড়ি ভেঙে গবাদিপশুসহ অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বাড়ি থেকে ১০টি গরু, ১৫টি ছাগল, ধান-চাল এবং বিভিন্ন মূল্যবান আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের না করে আমাদের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।

উকিল শেখের স্ত্রী সাজেদা বেগম বলেন, “হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। আমাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চালসহ প্রয়োজনীয় মালামাল তছনছ করা হয়েছে। আমরা যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, তার বিচার আইনের মাধ্যমে হোক। কিন্তু এভাবে বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষয়ক্ষতির সুষ্ঠু বিচার চাই।

তবে নিহতের ভাই শামীম শেখ ভাঙচুর-লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হত্যার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। আমরা চাই দ্রুত সবাইকে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হোক।

মধুখালী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. আজম খান বলেন, হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে একজন এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।

তিনি আরও বলেন, কোনো অপরাধের প্রতিকার আরেকটি অপরাধ হতে পারে না। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের পাশাপাশি ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।