০৬:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাগুরায় রাজিয়া হত্যা মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড


মাগুরার বহুল আলোচিত স্কুলছাত্রী রাজিয়া খাতুন (১৫) ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যা মামলায় একমাত্র আসামি হাসান শেখকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন নিহত রাজিয়ার পরিবার। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে।

সোমবার (২০ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ২০২২ সালের ১৭ মার্চ শ্রীপুর উপজেলার হাট শ্রীকোল গ্রামের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজিয়া খাতুনকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে আসামি হাসান শেখ তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

পরে ধারালো ব্লেড দিয়ে গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে মরদেহ পাশের একটি বাঁশঝাড়ে ফেলে রেখে যায়।
তিনি জানান, প্রথমে শ্রীপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা হয়। পরে সিআইডি ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত ও তদন্তের ভিত্তিতে হাসান শেখের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। মামলায়-১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আদালত হত্যাকারীর বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন। এখন রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা, আইনগত প্রক্রিয়া শেষে রায়টি দ্রুত কার্যকর করা হবে।

রায় ঘোষণার পর আবেগাপ্লুত রাজিয়ার মা বলেন, আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট। আমার মেয়েকে আর ফিরে পাব না। এখন শুধু চাই, যেন এই মৃত্যুদণ্ড দ্রুত কার্যকর হয়।

মামলার নথি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবসে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার শ্রীকোল ইউনিয়নের হাট শ্রীকোল গ্রামের বাসিন্দা ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজিয়া খাতুন বাড়ির পাশের রসুনক্ষেতে গেলে নিখোঁজ হয়। পরদিন ১৮ মার্চ দুপুরে বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে কুমার নদের তীরবর্তী একটি বাঁশঝাড়ের নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে র‌্যাব, পুলিশ ও সিআইডি একযোগে কাজ শুরু করে। ঘটনার দুই দিন পর ১৯ মার্চ একই গ্রামের ফজলু শেখের ছেলে ও পেশায় নছিমন চালক হাসান শেখকে আটক করে র‌্যাব-৬। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে জানায় র‌্যাব।

ঘটনার পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৬, যশোরের তৎকালীন কোম্পানি কমান্ডার জানান, রাজিয়াকে কৌশলে রসুনক্ষেত থেকে পাশের বাঁশঝাড়ে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। পরে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তদন্তে এ ঘটনায় হাসান শেখ একাই জড়িত বলে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানায় তদন্ত সংস্থা।

রাজিয়া হত্যাকাণ্ডের পর পুরো মাগুরাজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। হাট শ্রীকোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও মানববন্ধন করে দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

দীর্ঘ চার বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের এ রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছে রাজিয়ার পরিবার। তবে তাদের একটাই প্রত্যাশা-শিশু রাজিয়ার নির্মম হত্যার বিচার যেন কেবল রায়েই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত কার্যকর করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে এমন নৃশংস অপরাধ করার সাহস আর কেউ না পায়।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

মাদারীপুরের কালকিনি ও ডাসারের দুই প‌রিবার‌কে সহ‌যো‌গিতার হাত বা‌ড়ি‌য়ে দি‌লেন এম‌পি খোকন

মাগুরায় রাজিয়া হত্যা মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড

Update Time : ০৮:৪৬:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬


মাগুরার বহুল আলোচিত স্কুলছাত্রী রাজিয়া খাতুন (১৫) ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যা মামলায় একমাত্র আসামি হাসান শেখকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন নিহত রাজিয়ার পরিবার। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে।

সোমবার (২০ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ২০২২ সালের ১৭ মার্চ শ্রীপুর উপজেলার হাট শ্রীকোল গ্রামের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজিয়া খাতুনকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে আসামি হাসান শেখ তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

পরে ধারালো ব্লেড দিয়ে গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে মরদেহ পাশের একটি বাঁশঝাড়ে ফেলে রেখে যায়।
তিনি জানান, প্রথমে শ্রীপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা হয়। পরে সিআইডি ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত ও তদন্তের ভিত্তিতে হাসান শেখের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। মামলায়-১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আদালত হত্যাকারীর বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন। এখন রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা, আইনগত প্রক্রিয়া শেষে রায়টি দ্রুত কার্যকর করা হবে।

রায় ঘোষণার পর আবেগাপ্লুত রাজিয়ার মা বলেন, আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট। আমার মেয়েকে আর ফিরে পাব না। এখন শুধু চাই, যেন এই মৃত্যুদণ্ড দ্রুত কার্যকর হয়।

মামলার নথি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবসে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার শ্রীকোল ইউনিয়নের হাট শ্রীকোল গ্রামের বাসিন্দা ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজিয়া খাতুন বাড়ির পাশের রসুনক্ষেতে গেলে নিখোঁজ হয়। পরদিন ১৮ মার্চ দুপুরে বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে কুমার নদের তীরবর্তী একটি বাঁশঝাড়ের নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে র‌্যাব, পুলিশ ও সিআইডি একযোগে কাজ শুরু করে। ঘটনার দুই দিন পর ১৯ মার্চ একই গ্রামের ফজলু শেখের ছেলে ও পেশায় নছিমন চালক হাসান শেখকে আটক করে র‌্যাব-৬। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে জানায় র‌্যাব।

ঘটনার পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৬, যশোরের তৎকালীন কোম্পানি কমান্ডার জানান, রাজিয়াকে কৌশলে রসুনক্ষেত থেকে পাশের বাঁশঝাড়ে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। পরে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তদন্তে এ ঘটনায় হাসান শেখ একাই জড়িত বলে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানায় তদন্ত সংস্থা।

রাজিয়া হত্যাকাণ্ডের পর পুরো মাগুরাজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। হাট শ্রীকোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও মানববন্ধন করে দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

দীর্ঘ চার বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের এ রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছে রাজিয়ার পরিবার। তবে তাদের একটাই প্রত্যাশা-শিশু রাজিয়ার নির্মম হত্যার বিচার যেন কেবল রায়েই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত কার্যকর করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে এমন নৃশংস অপরাধ করার সাহস আর কেউ না পায়।