পদ্মা- যমুনায় রাতের আঁধারে ড্রেজারে নদী কাটছেন শিক্ষক মোন্তাজ: ফেরিঘাট দখলে বালুর রাজত্ব; নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নাম ব্যবহারের অভিযোগ, প্রশাসন ও নৌ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মোঃ আনোয়ার হোসেন শিবালয় (মানিকগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ফেরিঘাটের অদূরে দাশকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন পদ্মা- যমুনা নদী থেকে রাতের আঁধারে কাটার ড্রেজার বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় নালী বড়রিয়া কৃষ্ণচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোন্তাজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী অনুমোদিত বালুমহাল ছাড়া নদী থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি হলেও, মোন্তাজ চক্র প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত পদ্মার বুক চিরে অব্যাহতভাবে বালু তুলছে।
পরবর্তীতে উত্তোলিত বালু বাল্কহেডে করে এনে পাটুরিয়া ১ নম্বর ফেরিঘাটের সরকারি জায়গা দখল করে ফেলা হচ্ছে। ফলে সেখানে তৈরি হয়েছে ছোটখাটো পাহাড়সম বালুর গদি। বিআইডব্লিউটিএ-এর সীমানা নির্দেশক ‘ফোরশার পিলার’ জবরদখল করে গড়ে ওঠা প্রকাশ্য অবৈধ কর্মযজ্ঞে স্থানীয় নৌ পুলিশ ও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষকতার মতো মহান পেশার আড়ালে মোন্তাজ উদ্দিন পাটুরিয়া ঘাট এলাকার একচ্ছত্র বালু বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক। নিজেকে আড়ালে রাখতে তিনি সামনে দাঁড় করিয়েছেন আপন ভাগিনা আলমগীরকে। তবে পর্দার আড়াল থেকে সমস্ত পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেন তিনি নিজেই।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক কিছু বালু ব্যবসায়ীরা বলেন,প্রতি রাতে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেন,, ১ নং নাম্বার ঘাটে তার একটি বিশাল বালুর বেড রয়েছে সেখানে তিনি অবৈধ বালু স্তুপ করেন আবার ভোর হলেই দাস কান্দি প্রাইমারী স্কুলের পাশেই কাটার ড্রেজার রেখে চলে যান সবাই।
অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ কর্মযজ্ঞ নির্বিঘ্নে চালাতে মোন্তাজ উদ্দিন মূল মধ্যস্থতাকারী বা ‘ম্যানেজার’ হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন। পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চ ঘাট এলাকা দখল করে রাখা আরও অন্তত ১২ জন বালু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে তা বণ্টন করে ঝামেলা ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্বও তার কাঁধে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতারা তার ব্যবসায়িক অংশীদার- এ ধরনের তথ্য ছড়িয়ে এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে এই সিন্ডিকেট। তবে এসব নেপথ্য রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নাম ব্যবহারের বিষয়টি বা আসলেই তারা এই অবৈধ বাণিজ্যের সাথে জড়িত কি না, সে বিষয়ে সতত্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসী জানায়, যে পদ্মা – যমুনা নদী রক্ষা ও নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত নৌ পুলিশ থানা রয়েছে, তাদের নাকের ডগায় রাতের পর রাত ড্রেজার চালিয়ে পদ্মা যমুনা নদীর রূপ ও গতিপথ ধ্বংস করা হলেও তারা রহস্যজনকভাবে নীরব। প্রশাসন মাঝে মধ্যে ‘লোকদেখানো’ অভিযানের অংশ হিসেবে দু-একটি বালুর গদিকে সামান্য জরিমানা করলেও তা এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে নগণ্য।
স্থানীয়দের মতে, জরিমানা বা উচ্ছেদের ঘোষণা খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। মোন্তাজের তথাকথিত ‘ম্যানেজ ফর্মুলায়’ পরদিনই আবার ১ নম্বর ফেরিঘাট দখল করে নতুন করে বালু ফেলার কাজ শুরু হয়। কোনো স্থায়ী কঠোর আইনি পদক্ষেপ বা নিয়মিত ফৌজদারি মামলা না হওয়ায় দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এই চক্র।
সমগ্র ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান শিক্ষক মোন্তাজ উদ্দিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অভিযুক্তের এই ফোন না ধরা ও আত্মগোপন করার প্রবণতা পুরো বিষয়টিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।
অন্যদিকে, এই অবৈধ বালু উত্তোলন ও ঘাট দখলের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও নৌ পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিষা রাণী কর্মকার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, “রাতের আঁধারে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলে নৌ পুলিশ টহল দেয়, তারাই তো ব্যবস্থা নিতে পারে। এর আগেই নৌ পুলিশের ওসিকে নির্দেশ দিয়েছি- জড়িতদের গ্রেপ্তার ও তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করার জন্য।”
অথচ ইউএনও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার কথা বললেও সম্পূর্ণ বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন পাটুরিয়া নৌ পুলিশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম। নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সম্পূর্ণ উল্টো সুর তুলে বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
উপজেলা প্রশাসনের প্রধান স্পষ্ট ভাষায় ওসিকে মামলা ও গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়ার দাবি করলেও ওসির “অবগত নন” বলে মন্তব্য করা প্রশাসনিক গাফিলতি নাকি অপরাধীদের ছত্রচ্ছায়া দেওয়ার চেষ্টা- তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র সন্দেহের দানা বাঁধছে।
অভিযুক্ত শিক্ষকের নিরুদ্বেগ নীরবতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান গোটা বিষয়টিকেই গভীর রহস্যের ঘেরাটোপে ঠেলে দিয়েছে।
শিক্ষকতার মতো সম্মানিত পেশায় থেকে প্রশাসন ও রাজনীতির নাম ভাঙিয়ে নদী ধ্বংস এবং সরকারি জমি দখলের এই চক্র উৎখাতে কেবল নামমাত্র জরিমানা না করে, মূল হোতা শিক্ষক মোন্তাজ উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্টদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও নিয়মিত ফৌজদারি মামলার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : 



















